শিখনফল, সিলেবাস, বুক লিস্ট, পাঠ পরিকল্পনা, একাডেমিক ক্যালন্ডার ও রুটিন প্রণয়নের অ আ ক খ

একজন শ্রেণিশিক্ষককে সংশ্লিষ্ট ক্লাসের পুরো বছরের সার্বিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হয়। এই পরিকল্পনায় অনেক কিছুই অন্তর্ভুক্ত থাকে। এসবের মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আজকের ব্লগপোস্টে আলোচনা করা হবে- যথা, সিলেবাস প্রণয়ন, লেসন প্লান বা পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং শিখন দক্ষতা অর্জন। এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে এসবের মধ্যে বিদ্যমান সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যগুলো স্পষ্ট করা হবে। এতে সকল শিক্ষকের পক্ষে এর অনুধাবন সহজতর হবে, এবং পরবর্তীতে ক্লাসের সাংবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন সুক্ষভাবে সম্পাদন করা সম্ভব হবে। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্নমুখি পরিকল্পনা প্রণয়ন যেমন করা যাবে তেমনি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হবে। . ক) শিখনফল অর্জনঃ কোন ক্লাসের যতসব পরিকল্পনা রয়েছে, তার মধ্যে শিখন দক্ষতা অর্জনের পরিকল্পনা সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একে বলা হয় “ফাদার অফ অল প্ল্যান্স”। একে তুলনা করা যেতে পারে যে কোন ক্লাসের লক্ষ্য – উদ্দেশ্য হিসেবে। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা স্কুলের সকল পরিকল্পনার আগে স্থির করতে হয় সেই প্রতিষ্ঠান স্থাপনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য (মিশন ভিশন অব্জেক্টিভস)। ক্লাস ভিত্তিক শিখন দক্ষতা অর্জনের পরিকল্পনা মূলত মিশন ভিশনের পরবর্তী মাইক্রো পরিকল্পনা।

মিশন, ভিশন, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য- উদ্দেশ্য>>>>> শিখন দক্ষতা অর্জন পরিকল্পনা


কোন ক্লাসের সিলেবাস প্রণয়ন, পুস্তক তালিকা প্রণয়ন, পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন কিংবা রুটিন চূড়ান্ত করণ, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নির্ধারণ ইত্যাদি সবকিছুই নির্ভর করে এই শিখন দক্ষতা অর্জনের পরিকল্পনার উপর।


এ জন্য একজন শিক্ষককে সর্বাগ্রে পরিকল্পনা করতে হবে একটি শিক্ষাবর্ষ শেষে সংশ্লিষ্ট ক্লাসের শিক্ষার্থীদের কী কী দক্ষতা শেখানো হবে সেই পরিকল্পনার উপর। এজন্যই একজন শিক্ষক, বা পরিকল্পক বা শিক্ষাদ্যোক্তাকে ভাবতে হয় তিনি একটি বছর শেষে সেই ক্লাসের শিক্ষার্থীদের কোন কোন দক্ষতা অর্জনের জন্য উদ্যোগ নিতে চান। ধরা যাক, প্লে ক্লাসের একজন শিক্ষার্থী যে সকল শিক্ষন দক্ষতা অর্জন করতে শেখানো হবে তার তালিকা নিম্নরুপঃ ১) গান – ৬টি ২) রং করা-৬টি ৩) বর্ণ লিখন- ৪) বর্ণ উচ্চারণ ৫) গুণতে শেখা-২০ পর্যন্ত ৬) অংক লিখা- ১-২০ পর্যন্ত ৭) অভিনয়- ২টি বিষয়ে ৮) মেয়েদের ক্ষেত্রে, নৃত্য ৯) প্রাকটিক্যাল/ব্যবহারিক জ্ঞানার্জন: হাঁটতে শেখা, সালাম দিতে শেখা, সম্মান করতে শেখা, পিটি- প্যারেড করতে শেখা, জাতীয় সংগীত গাইতে শেখা, ১০) স্টাডি ট্যুর – ৬টি ১১) রাস্তার ডান দিক হাঁটতে শেখা ১৩) রাস্তা পারাপার করতে শেখা ১৪) খেলাধুলা ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন ইত্যাদির প্রাথমিক ধারণা শেখা



খ) সিলেবাস প্রণয়নঃ সিলেবাদ ধারণার সাথে বা সিলেবাস বই এর সাথে আমরা সবাই কম বেশি পরিচিত। কিন্তু সিলেবাস কিভাবে আসল, বা কিসের ভিত্তিতে একটি সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়, সিলেবাস প্রণয়নের জন্য মুল সোর্স বা রেফারেন্স হিসেবে কোন বিষয়টি কাজে লাগে, তা আমরা অনেকেই জানিনা। স্বভাবতই আমরা মনে করি, সিলেবাসই প্রথম রেফারেন্স বুক, এবং এর আগে অন্য কোন বিষয়ের পরিকল্লনা প্রয়োজন নেই। বিষয়টি আসলে তা নয়। আসলে সিলেবাস প্রণয়নের কাজটি ৪র্থ ধাপের কার্যক্রম। এক্ষেত্রে ১ম ধাপ- শিক্ষানীতি ২০১০ এর আলোকে লক্ষ্য উদ্দেশ্য নির্ধারণ ২য় ধাপ- বয়স ভিত্তিক লক্ষ্য -উদ্দেশ্য নির্ধারণ ৩য় ধাপ- শিখন দক্ষতা ভিত্তিক পরিকল্পন প্রণয়ন ৪র্থ ধাপ- সিলেবাস প্রণয়ন



শিখন দক্ষতা ভিত্তিক পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়। সিলেবাস মূলত বই এর আকারে শিক্ষার্থী বা শিক্ষকদের হাতে পৌঁছে থাকে। তবে ‘সিলেবাস‘ এবং ‘সিলেবাস বই’ এর মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সিলেবাস মূলত শিক্ষন দক্ষতা অর্জনের জন্য যা যা করা প্রয়োজন তার লিখিত বা অলিখিত তালিকা মাত্র। এতে সাধরণত যেসব বিষয় শেখানো হবে সেসব বিষয়সমূহ গ্রন্থিত করা থাকে।

অন্যদিকে, সিলেবাস এর লিখিত ফর্মই হচ্ছে সিলেবাস বই। তবে সিলেবাস বই তে মুল সিলেবাস এর সাথে আরো কিছু বিষয় যোগ করা হয়ে থাকে। যেমন বই সিলেবাসে সিলেবাস এর পাশাপাশি পুস্তক তালিকা, মানবন্টন, পরীক্ষার সময়সূচি ইত্যাদি যুক্ত করা থাকে, যাতে অভিভাবকরা সহজে সিলেবাস বই অনুসরণ করে সবকিছু সহজে বুঝতে পারে।


এখানে ‘পঠিতব্য বই‘ এবং ‘পঠিতব্য বিষয়‘ সম্পর্কে ধারণা ক্লিয়ার করা প্রয়োজন৷ এতে সিলেবাস এবং সিলেবাস বই এর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে সুবিধা হবে। সাধারণত পঠিতব্য বিষয় হচ্ছে সিলেবাস এর বিষয়। অন্যদিকে, পঠিতব্য বই হচ্ছে সিলেবাসে উল্লিখিত পুস্তক। সিলেবাসে প্রথমত যেসব বিষয় লিখিত থাকে, সেসব বিষয়ের উপর বিস্তারিতভাবে সুলিখিত গ্রন্থিত জিনিসকেই বই পুস্তক/বই/পঠিতব্য বই বলা হয়ে থাকে। সিলেবাসের বিষয় হচ্ছে সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সিলেবাসের আলোকে লিখিত বই হচ্ছে বিস্তারিত। ফলে বই অনুসরণ করে ক্লাসে পাঠদান করা শিক্ষকের পক্ষে যেমন সহজতর, তেমনি শিক্ষার্থী এবং/অথবা অভিভাবকদের পক্ষে অনুধাবন করাও সহজতর।



গ) পুস্তক/ বই/পুস্তক তালিকা/বুক লিস্টঃ

সিলেবাস এর ন্যায় বুক লিস্ট/বই তালিকার সাথেও সকল অভিভাবক বা শিক্ষকরা পরিচিত। কারণ এই বুক লিস্ট বা পুস্তক তালিকা আলাদাভাবে বা সিলেবাস বই এর সাথে সহজেই দৃষ্টিগোচর হয়। সাধারণত শিখন দক্ষতা অর্জনসমূহ সরকারি কারিকুলাম প্রণয়ন কমিটি তালিকাবদ্ধ করে থাকে সরকার গৃহীত শিক্ষানীতির আলোকে। এই শিখন দক্ষতার উপর ভিত্তি করেই বিভিন্ন দক্ষ, অভিজ্ঞ বিষয় বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ বা শিক্ষাবিদগণ বই লিখে থাকেন। এসব বই সরকারি বা বেসরকারি প্রকাশনা কমিটি প্রকাশ করে থাকে। সাধারণত বিভিন্ন স্কুল তাদের শিখন দক্ষতা অর্জনের জন্য পরিকল্পিত বিষয়ের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ক্লাসের জন্য বই নির্ধারণ করে থাকে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে ক্লাস ওয়ান থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক বই সরকারিভাবে প্রকাশিত হয়ে থাকে। এসব বই অনুসরণ করা সকল স্কুল/মাদ্রাসা/কলেজের জন্য বাধ্যতামূলক। তবে এসব বই এর পাশাপাশি অতিরিক্ত বই বিভিন্ন স্কুল অনুসরণ করে থাকে। অন্যদিকে প্রি প্রাইমারী সেকশানের বই সমূহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রকাশনা প্রকাশ করে থাকে। ইন্টেলিজেন্টসিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রি প্রাইমারি সেকশানের বই এর ক্ষেত্রে তাদের পূর্ব নির্ধারিত সিলেবাস বিষয়ের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন প্রকাশনীর বইকে তাদের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করেছে।



ঘ) লেসন প্লান/ পাঠদান পরিকল্পনাঃ কোন ক্লাসের জন্য বিষয়, বিষিয়ভিত্তিক বই চূড়ান্ত করার পরের ধাপের কার্যক্রম হচ্ছে লেসন প্লান প্রণয়ন করা।

একটি লেসন প্ল্যানের ছক নিম্নে দেয়া হলঃ

সাধারণত লেসন প্ল্যানে একটি বইকে কতটি ক্লাসে পড়ানো হবে, কোন ক্লাস, বা কততম ক্লাসে কোন অধ্যায় পড়ানো হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। এই লেসন প্লান প্রনয়নের জন্য একজন শিক্ষককে পুরো বছরে মোট কতদিন ক্লাস হবে, কত দিন পরীক্ষা হবে, কতদিন অন্য উপলক্ষে স্কুল বন্ধ থাকবে, পাবলিক হলিডে কতদিন ইত্যাদি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ধারণা থাকতে হয়। ক্লাসের দিন সংখ্যার উপর করেই লেসন প্ল্যান প্রণয়ন করতে হয়। এজন্য, কোন লেসন প্ল্যান প্রণয়নের পূর্বে মোট ক্লাস কত দিন হবে, এবং বছরে কয়টি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত তা অবশ্যই চূড়ান্ত করতে হবে। ২০২০ সালের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারি ছুটির তালিকা-




ঙ) ক্লাস রুটিনঃ

লেসন প্ল্যান এর বই যে কাজটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেটি হচ্ছে রুটিন প্রণয়ন করা। রুটিন এর আলোকেই প্রতিদিন ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। বই এর গুরুত্ব, পাবলিক এক্সাম, শ্রেণি, শ্রেণি শিক্ষক ও বিষয় শিক্ষকের মান, সহজলভ্যতা ইত্যাদি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে রুটিন করা হয়ে থাকে। রুটিন সাধারণত কয়েকভাবে প্রণয়ন করা হয়ে থাকে। মাস্টার রুটিন, টিচার্স ব্যক্তিগত রুটিন, শ্রেণি রুটিন ইত্যাদি প্রণয়ন করা হয় যাতে সকলে তাদের কার্যক্রম খুব সহজে অনুধাবন করতে পারে। সাধারণত রুটিন প্রণয়ন করা একটি জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এজন্য প্রতিষ্ঠান প্রধান বা উপ প্রধান বা সহকারি প্রধানকেই এই রুটন প্রণয়ন এর কাজ করতে হয়। কারণ এখানে অনেক পলিসি রিলেটেড বিষয় জড়িত থাকে।


একজন জাত শিক্ষকের এসব বিষয় জানা ও বুঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যিনি ক্লাস / বিষয় শিক্ষক তার সব বিষয় না জানলেও চলে, তবে যে শিক্ষক প্রশাসন ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত তাকে অবশ্যই এসব বিষয়ে জানতে হয়। তবে একজন সহকারী শিক্ষক বা সিনিয়র শিক্ষক সকলকে আবশ্যিকভাবে শিক্ষন ফল বা শিখন দক্ষতা অর্জনের বিষয়ে সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে।



চ) একাডেমিক ক্যালেন্ডারঃ

প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব একাডেমিক ক্যালেন্ডার (এ/ক্যা) প্রস্তুত করে। এ/ক্যা একটি প্রতিষ্ঠানের আয়নাস্বরুপ। এখানে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সারা বছরের প্রধান প্রধান কার্যক্রমের তথ্য সন্নিবেশিত থাকে। একটি প্রতিষ্ঠাতা কতটুকু গুছালো, পরিকল্পিত ও সুবিন্যস্তভাবে তার কার্যক্রম পরিচালিত করতে পারে বা পারবে তা সেই প্রতিষ্ঠানের নির্মিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার এবং তার সমায়ানুক্রমিম বাস্তবায়ন যোগ্যতার মাধ্যমে বুঝা যায়।


একটি এ্যা/ক্যা প্রস্তুত করার কাজটি এত সহজ নয়। কারণ এ্যা/ক্যা প্রস্তুত করার পূর্বেই পুরো বছরের সকল পরিকল্পনা করতে হয়। বলা যায়, আগে সারা বছরের পরিকল্পনা করতে হয়, তারপরই কেবলমাত্র এ্যা/ক্যা করা সম্ভব হয়। অন্যভাবে বলা যেতে পারে, এ্যা/ক্যা হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রমের পরিকল্পনার একটি লিখিত ক্যালেন্ডার মাত্র।


[নোটঃ ইনটেলিজেন্টসিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ,বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকার সকল শিক্ষক এসব বিষয়ে একটি সুষ্পষ্ট ধারণা প্রদানের নিমিত্ত ডিসটান্ট লার্নিং এর উপকরণ হিসেবে এটি লিখিত হল।]


Reference: Link
17 views0 comments
Theme Song_ISC
00:00 / 03:15